ছায়ার ডাক দ্বিতীয় পর্ব

আমাদের নতুন সাসপেন্স থ্রিলার গল্প নিয়ে ছায়ার ডাক দ্বিতীয় পর্ব আমরা হাজির হয়েছি আশা করি আমাদের আগের গল্প মত আপনারা এটিকেও অনেক ভালোবাসা দেবেন ।

ছায়ার ডাক :দ্বিতীয় পর্ব

চন্দ্রাবলী জানত, তার মুক্তি কোনো রাজকৃপা নয়—এ এক ভ্রম। রাজাধিরাজের চোখে যে কোমলতা দেখেছিল, তা ছিল তার মন্ত্রের প্রভাব, তার বৈরাগ্য-মোহন তন্ত্র। কিন্তু সেই প্রভাব বেশিক্ষণ টিকবে না, সে ভালো করেই জানত। তাই দড়ি ছুটে যাওয়ার মুহূর্তেই তার দৃষ্টি সোজা দরজার দিকে।বাইরে ভোরের আলো ফুঁটে উঠছে, প্রহরীরা ঘোরের মধ্যে। চন্দ্রাবলী নিঃশব্দে পা বাড়াল।

পাথরের মেঝেতে তার পায়ের নূপুরের এক বিন্দু শব্দও পড়ল না—তন্ত্রের আরেক ক্ষমতা।দরজার বাইরে প্রাসাদের উঠোন—আকাশে হালকা ধোঁয়া, দূরে রাজবাহিনীর প্রহরা পরিবর্তন হচ্ছে। সেই ফাঁকে, এক পুরোনো রথচালককে সে চেনত—নন্দিন, তার গোপন শিষ্য। তাকে ইঙ্গিত করতেই, নন্দিন বুঝে গেল। মুহূর্তে রথ ঘোরানো হল পশ্চিম দরজার দিকে, যেদিকে প্রহরীদের নজর কম।চন্দ্রাবলী উঠল রথে, সাদা ঘোড়ার লাগাম টানল এক ধাক্কায়। রথের চাকা পাথর ছুঁয়ে ঝলসে উঠল আগুনের মতো, আর প্রাসাদের দালানগুলো পিছিয়ে গেল ঝড়ের গতিতে।“দ্রুত, নন্দিন!”—তার কণ্ঠে আদেশ নয়, জাদু।

ছায়ার ডাক :দ্বিতীয় পর্ব চন্দ্রাবলীর পলায়ন

ঘোড়াগুলো যেন সেই কণ্ঠেই মন্ত্রবিদ্ধ হয়ে গেল।অরণ্যের পথ ধরে রথ ছুটে চলল। চারদিকে কুয়াশা, পাখির ডানা ছুঁয়ে সূর্যের প্রথম আলো ভেসে বেড়াচ্ছে গাছের ফাঁক দিয়ে। চন্দ্রাবলী মাথার কাপড় টেনে মুখ ঢাকল।সে জানত, এ পথই তার একমাত্র মুক্তির পথ নয়—এ পথই তার পরীক্ষার শুরু।প্রাসাদের রাজমহলে তখন অস্থিরতা। দেবব্রত সিংহাসনে বসে আছেন, চোখে আগুন। সেই আগুন আর প্রেমের আলো একসাথে জ্বলছে—যেমন কোনো তপস্যার পরিণতি আবার পাপের সূচনা হয়।“সে কোথায়?”—রাজাধিরাজের গর্জন শোনা গেল।“মহারাজ, প্রহরীরা… তারা ঘোরে ছিল, তাই—”“আমি তোমাদের জীবনে শেষ করব!”—রাজা উঠে দাঁড়ালেন।তার চোখের নিচে এখনও সেই মন্ত্রের ছায়া।

এক মুহূর্তে সে স্মৃতি ফিরে এল—চন্দ্রাবলীর চোখ, তার কণ্ঠ, সেই অদ্ভুত শান্তি যা তাকে নিঃশব্দে বেঁধে ফেলেছিল।“সে আমাকে বোকা বানিয়েছে,” রাজা ফিসফিস করে বললেন, “আমার সিংহাসন, আমার রাজ্য—সবকিছুই তার হাতে চলে যাবে যদি সে সেই বই নিয়ে পালায়।”বই—হ্যাঁ, সেই নিষিদ্ধ গ্রন্থ ‘কালতত্ত্ব তন্ত্র’, যা  দেবে অসীম শক্তি । রাজা সেটি চেয়েছিলেন সাম্রাজ্যের শক্তির জন্য, কিন্তু চন্দ্রাবলী জানত—যে  রাজা এর অপব্যবহার করবে, রাজ্যই হবে প্রথম বলি।“ঘোড়া সাজাও! সৈন্য পাঠাও!”—আদেশ এল বজ্রের মতো।“ওকে জীবিত ধরতে হবে। বুঝেছ?

জীবিত!”দরবার কেঁপে উঠল।অরণ্যে বাতাস গাঢ় হয়ে উঠেছে। রথ ছুটছে, কিন্তু চন্দ্রাবলী বুঝতে পারছে, পেছনে কিছু একটা বদলে গেছে। দূরে বাজছে শিঙ্গা—রাজবাহিনীর সংকেত।“ওরা এসেছে…”—নন্দিন বলল।চন্দ্রাবলী চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তার ঠোঁটে মন্ত্রের শব্দ ফুটে উঠল—“ॐ भैरवाय नमः, পথরক্ষা করো নাথ।”ঘোড়াগুলোর চোখ লাল হয়ে উঠল। রথ যেন বাতাসে উড়ে গেল। পেছনে তীরের শব্দ, ধোঁয়া আর ধূলির ঝড়। রাজবাহিনী পিছনে মাত্র কয়েক গজ দূরে।বজ্রের মতো কণ্ঠে সেনাপতি চেঁচিয়ে উঠল, “ধরো! রাজবন্দিনীকে ধরো!”তীর এসে পাশ দিয়ে ছুঁয়ে গেল। চন্দ্রাবলী চোখ বন্ধ করে হাত উঁচু করল—তার আঙুলে নীল আভা জ্বলে উঠল। মুহূর্তে বাতাস ঘূর্ণি হয়ে উঠল, তীরগুলো মাটিতে পড়ল যেন অদৃশ্য প্রাচীরের সামনে।নন্দিন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

চন্দ্রাবলীর আত্মত্যাগ

“মাতা… আপনি তো বলেছেন, এ শক্তি আর ব্যবহার করবেন না!”চন্দ্রাবলী চুপ করে বলল, “যখন ধর্ম রক্ষা পণের বিষয়, তখন নিষেধ মানে পাপ।”রথ এখন গভীর বনে ঢুকে পড়েছে। গাছের মাথা মিলেমিশে সূর্যালোক ঢুকতে দিচ্ছে না, কুয়াশা ঘন, হাওয়ায় গন্ধ—মাটি, পাতা, ভয়।পেছনে রাজবাহিনীর শিঙ্গা আরও কাছে। তাড়ার শব্দে বাতাস কাঁপছে।চন্দ্রাবলীর মনে হঠাৎ ভেসে উঠল তার গুরু দেবী শ্রী আচার্যাণীর মুখ।“স্মরণ রেখো, চন্দ্রাবলী,” তিনি বলেছিলেন, “যে শক্তি তুমি পেয়েছ, তা রাজাদের জন্য নয়, মানুষের জন্য। একদিন  তোমাকে পরীক্ষা দিতে হবে —তখন নিজের মনের কথা শুনবে।”চোখের কোণে জল এসে গেল।

“আমি ভুল করেছি, গুরুমা…”—সে ফিসফিস করল ।রাজবাহিনী তখন বনের ধারে পৌঁছে গেছে। দেবব্রত নিজে সামনে। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা—প্রেম, রাগ, আর ভয় একসাথে জ্বলে উঠছে।“ওকে ধরো!”—সে চেঁচিয়ে উঠল।কিন্তু সৈন্যরা একে একে থমকে যাচ্ছে। বনটা কেমন যেন বদলে গেছে। গাছের পাতাগুলো দুলছে, যেন বাতাস নয়—কেউ শ্বাস নিচ্ছে তাদের মধ্যে। পাখিরা উড়ে গেছে, আকাশের রঙ গাঢ় হয়ে উঠছে।

হঠাৎ এক ঘূর্ণিঝড়ের মতো ধোঁয়া উঠল সামনে থেকে।রথ তখন এক বাঁক ঘুরে গিয়েছে, কিন্তু দেবব্রত দেখল—ধোঁয়ার ভেতরে চন্দ্রাবলীর ছায়া, হাত জোড় করে কিছু একটায় মন্ত্র জপছে।“তুমি পালাতে পারবে না!”—রাজা তলোয়ার তুলে বললেন।চন্দ্রাবলীর চোখে তখন অন্য আলো—বৈরাগ্যের নয়, বরং তপস্যার।“আমি পালাচ্ছি না, মহারাজ,” তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনি, “আমি রক্ষা করছি তোমাকেই—নিজের পাপ থেকে।”ধোঁয়া ছেয়ে গেল চারদিক।

ঘোড়াগুলোর চোখে আগুনের প্রতিচ্ছবি। হঠাৎ বজ্রপাত। রাজবাহিনী একসাথে চিৎকার করে উঠল।বন নিস্তব্ধ। শুধু দূরে জলধারার শব্দ। চন্দ্রাবলীর রথ থেমে গেছে এক অজানা নদীর ধারে। নন্দিন অচেতন।সে নেমে এসে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ জমছে।“সময় নেই…” সে নিজেকে বলল।তার গলার মালা থেকে ছোট্ট তাম্রতালার পুঁথি খুলে আনল—সেই নিষিদ্ধ ‘কালতত্ত্ব তন্ত্র’। পাতাগুলো যেন শ্বাস নিচ্ছে, অক্ষরগুলো লাল আভায় দপদপ করছে।চন্দ্রাবলী হাত জোড় করল—“ভগবান ভৈরব, আমায় রক্ষা করো, আর এই জ্ঞানকে সেই স্থানে পৌঁছে দাও, যেখানে কোনো রাজা, কোনো লোভী মানুষের হাত পড়বে না।”সে মন্ত্র জপ শুরু করল। বাতাস থেমে গেল। নদীর জল ঘূর্ণি তুলল।

পাতাগুলো একে একে ছিঁড়ে গিয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল—যেন জ্ঞান নিজেই আকাশে ফিরে গেল।এদিকে রাজাধিরাজ দেবব্রত বনের ধারে এসে পৌঁছেছেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি, মুখে তীব্র রাগ আর অনুশোচনা।“চন্দ্রাবলী!”—তিনি চিৎকার করলেন।কিন্তু উত্তর নেই। কেবল নদীর গর্জন, আর দূরে রথের ধোঁয়া।নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রাজাধিরাজ দেবব্রত চিৎকার করে উঠলেন

আগামী পর্ব : ছায়ার ডাক

—“চন্দ্রাবলী! সেই গ্রন্থটা দাও! ঐ জ্ঞান এখন রাজ্যের সম্পদ!”চন্দ্রাবলী নদীর পাড়ে স্থির। বাতাসে তার চুল উড়ছে, চোখে আগুনের প্রতিফলন।“না, মহারাজ,” সে শান্ত গলায় বলল, “এই জ্ঞান কারও সম্পদ নয়—এ শুধু ভৈরবের।”সে চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটে মন্ত্র—“ॐ कालभैरवाय नमः…”

ছায়ার ডাক প্রথম পর্ব ছায়ার ডাক তৃতীয় পর্ব

আমাদের অন্যান্য গল্প

১)কলকেতু

২) কমেডি কিং বিপিনবাবু

৩) কন্যাদান

এছাড়াও সাসপেন্স থ্রিলার এ ব্যাবহারিত বিভিন্ন শব্দ অর্থাৎ কলজাদু ও বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারত জানতে Wikipedia.com visit করতে পারবেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!