ঘড়ির কাঁটা

লেখিকা : paushali Banerjee

শহরের এক পুরনো পাহাড়ি পথে, ছায়াঘেরা অরণ্যের মাঝে অবস্থিত ‘হোটেল নিশিথিনী’। ব্রিটিশ আমলের এই হোটেলটি একসময় ছিল জমকালো, এখন প্রায় জনশূন্য। তবে লোককথা বলে, এই হোটেল বন্ধ হয়নি, হোটেল নিজেই মানুষকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।কলকাতার তরুণ লেখিকা রোহিনী, তাঁর নতুন উপন্যাসের গবেষণার জন্য এখানে একরাত থাকতে চাইলেন। ভৌতিক গল্প লেখেন তিনি, তাই বাস্তব অভিজ্ঞতা খুঁজতে এসেছেন।হোটেলে ঢোকার মুখেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। ম্যানেজার বলে পরিচয় দিল এক বৃদ্ধ, নাম ‘মোহনদা’। তিনি কোনো সাইন ইন করতে বললেন না, শুধু একটা কথা বললেন—“রাত বারোটার পরে দরজা খুলবেন না, আর হোটেলের ঘড়ির দিকে তাকাবেন না।”রোহিনী হেসে ফেললেন, “এ আবার কী কথা!”মোহনদা শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আপনার লেখার জন্য যা দরকার, তাই পাবেন। তবে সাবধান।”ঘরটা পুরনো, কিন্তু পরিষ্কার। এককোনা দেয়ালে একটা অদ্ভুত ঘড়ি—তার কাঁটা চলছিল উলটো দিকে।রাতের খাওয়া শেষ করে রোহিনী বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝরাতে হঠাৎ একটা আওয়াজে তাঁর ঘুম ভাঙল—একটা ঘড়ির টিক টিক, কিন্তু জোরে, যেন কানে চেপে বাজছে। বাইরে তাকিয়ে দেখেন, চারপাশ অন্ধকার। হঠাৎ দরজায় তিনবার টোকা। ধক করে ওঠে বুকটা।“কে?”—সাড়া পান না।দরজার নিচ দিয়ে কালো ধোঁয়া ঘরের ভিতর ঢুকতে শুরু করল। ঘড়ির কাঁটা তখন ঘোরাফেরা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে একেবারে ১২টার উপর। ঘর ঠান্ডা হতে হতে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। রোহিনী ছুটে দরজার দিকে গেলেন, খুলে ফেললেন।সামনে এক বালিকা দাঁড়িয়ে। পঞ্চাশের দশকের পোশাক, সাদা জামা, কাঁচা চুল। চোখ দুটো গভীর, অথচ শুন্য।“তুমি কে?” — রোহিনী কাঁপা গলায় প্রশ্ন করেন।মেয়েটি বলল, “আমি রুবি। আমায় খুঁজে বের করো। ওরা আমায় আটকে রেখেছে।”তারপর মুহূর্তে অদৃশ্য।রোহিনী আতঙ্কিত। পরদিন সকাল হতেই তিনি মোহনদাকে ঘটনাটা বললেন।মোহনদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই হোটেলে ১৯৫৭ সালে এক ছোট মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। তখন হোটেলে এক ইংরেজ পরিবারের সাথে সে এসেছিল। রাত্রে ঘুমের মধ্যে উঠে কোথাও চলে যায়—আর কখনও ফিরে আসে না।”রোহিনী অবাক—রুবির মুখে তো সেই বছরটাই শোনা গেল!মোহনদা বললেন, “ঘড়িটার কাঁটা ঘোরে উলটো দিকে কারণ রুবির সময় আটকে গেছে। সে চলে গিয়েছিল ‘ঘড়ির কাঁটার ওপারে’। আপনি যদি সাহসী হন, তবে আপনি পারেন তাকে ফিরিয়ে আনতে।”রোহিনী ঠিক করলেন—উপন্যাস নয়, এবার সত্যি সত্যিই এক আত্মাকে মুক্ত করবেন।রাত নামল। তিনি আবার সেই ঘরে ফিরে এলেন। ঘড়ির কাঁটা আবার ১২টার দিকেই ঘুরছে। হঠাৎ ঘরের দেওয়ালে ছায়া, আর রুবি ফিরে এল।“আমায় খুঁজে বের করো,”—সে আবার বলল।রোহিনী বললেন, “তুমি কোথায়?”রুবি জানাল, “ঘড়ির পেছনে আমার জগৎ। একবার কাঁটাকে থামাতে পারলেই, আমি মুক্তি পাব।”তখন রোহিনী ঘড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাহস করে কাঁটায় হাত দিলেন—আর তখনই ঘরের সব আলো নিভে গেল। ঘূর্ণিঝড়ের মতো এক টান তাঁকে নিয়ে গেল অন্য জগতে।সবকিছু সাদা, ফাঁকা, নিঃশব্দ। একটিমাত্র দরজা সামনে। খুলতেই রুবি সেখানে, একা, নির্জন।রোহিনী বললেন, “চলো, তোমায় নিয়ে যাচ্ছি।”রুবির মুখে প্রথমবার হাসি ফুটল। সে রোহিনীর হাত ধরল।ভোরবেলা হোটেলের মেঝেতে জ্ঞান ফিরে পেলেন রোহিনী। পাশে ঘড়ি, এবার তার কাঁটা স্বাভাবিকভাবে ঘুরছে। আর দেওয়ালের উপরে একটা ছবি—একটি মেয়ের, যার নিচে লেখা:

“রুবি, ১৯৫৭–২০২5 (Finally at Peace)”

3 thoughts on “ঘড়ির কাঁটা”

Leave a Comment

error: Content is protected !!