আমাদের নতুন সাসপেন্স থ্রিলার গল্প নিয়ে ছায়ার ডাক তৃতীয় পর্ব নিয়ে, আমরা হাজির হয়েছি আশা করি আমাদের আগের গল্পর মত আপনারা এটিকেও অনেক ভালোবাসা দেবেন ।
ছায়ার ডাক : চতুর্থ পর্ব
সকল ৪.৩০ মিনিট
রুবি ভোরে জেগে উঠল, কিন্তু ঘুমের আচ্ছন্নতা তখনও যেন তার চোখের পাতায় ঝুলে আছে। স্বপ্ন দেখেছিল—এইটুকু সে জানে। কিন্তু কী স্বপ্ন? যতই মনে করতে চায়, ততই যেন মনের পর্দা ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইছিল… তারপর হঠাৎই সব মিলিয়ে গেল ভোরের আলোয়।জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ছে বিছানায়। রুবি উঠে বসে। দূরে মোরগ ডাকছে, বাতাসে কাঁচা ধানের গন্ধ।
দক্ষিণনগরের সকাল মানেই এমন শান্ত এক বিস্তার, যেখানে সময়ও কখনও হাঁটাহাঁটি করে ক্লান্ত হয় না।রুবির পরিবার বড়। তাদের বংশের তিন ভাই—রুবির বাবা এবং দুই কাকা। বড় কাকু শহরে, সরকারি চাকরিতে, স্ত্রী-পুত্র নিয়ে আলাদা সংসার। আর বাকি দুই ভাই—রুবির বাবা ও ছোট কাকু—দক্ষিণনগরেই, তবে দু’জনের ঘর আলাদা, চুলা আলাদা, তবু রক্তের টান যে থাকে, তা অনুভব করা যায়।
পুজোর সময় কিংবা বিয়েবাড়ির উৎসবে এই পরিবারটাই যেন একটা বিশাল নদী হয়ে ওঠে, যার স্রোতে সবাই মিশে যায়।রুবির নিজের বাড়িটা গ্রামটির পশ্চিম কোণে। সাদা দেওয়ালে নীল রঙের দোরগোছা, সামনে একটুখানি উঠোন, আর তার মাঝখানে একটা তুলসিতলা। চারজনের সংসার—বাবা, মা, দাদা আর সে নিজে। দাদা এখন শহরে কলেজে পড়ে, মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি আসে। মা প্রতিদিনের মতো ভোর থেকে কাজ সামলাতে শুরু করেছেন—চুলোর আঁচ, চায়ের গন্ধ, আর বাবার টিফিনের পাত্রে ভাতের ভাপ।
রুবি মুখ ধুয়ে আয়নায় তাকায়। তার চোখে এখনো একচিলতে ঘুম, তবু মুখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। আজ কলেজে যেতে ইচ্ছে করছে আরও বেশি। আজ সান্দিপ ভট্টাচার্যের লেকচার আছে—সাহিত্যের সেই অধ্যাপক যিনি ক্লাসরুমে বইয়ের পাতা নয়, মানুষের হৃদয়ের গল্প খুলে ধরেন। তাঁর কণ্ঠে যখন রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের লাইন উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় যেন বাতাসও থমকে যায় শুনতে।রুবি আজ তাঁকে প্রশ্ন করবে ‘অচলায়তন’-এর সেই শেষ দৃশ্যটা নিয়ে।
গতবারের ক্লাসে স্যার বলেছিলেন, “স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা খুব ক্ষীণ—কখনও কখনও মানুষ বুঝতেই পারে না সে জেগে আছে, না ঘুমোচ্ছে।” কথাটা রুবির মনে গেঁথে গেছে। আজ সকালে জেগে ওঠার পর থেকেই সে যেন সেই সীমারেখার ভেতরেই আটকে আছে।“রুবি, খেয়ে নে, দেরি হচ্ছে!” — মায়ের গলা ভেসে আসে রান্নাঘর থেকে।রুবি তাড়াতাড়ি বই আর খাতা ব্যাগে ভরে নেয়। বাইরে বেরোতেই বাবা বলেন, “আজ গরম পড়বে, ছাতা নিয়ে যা।”সে মাথা নেড়ে হেসে সম্মতি জানায়।
বাড়ির উঠোন পেরিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে রুবি চারপাশে তাকায়—কোথাও বাচ্চারা স্কুলের দিকে ছুটছে, কোথাও মহিলারা কুয়ো থেকে জল তুলছে, বাতাসে দুধওয়ালার সাইকেলের ঘণ্টা বাজছে।হঠাৎই এক মুহূর্তের জন্য তার মনে ঝলসে ওঠে—সেই স্বপ্নের ছায়া। কেউ যেন ডেকেছিল, খুব নরম স্বরে, ঠিক এই পথেই…রুবি থমকে দাঁড়ায়। চারপাশ নিঃস্তব্ধ। শুধু বাতাসে ধানের পাতা দুলছে।তার মনে প্রশ্ন জাগে—আজকের সকালটা কি কেবল আরেকটা দিন?না কি, আজ থেকেই শুরু হবে এক অদ্ভুত গল্প, যেখানে বাস্তব আর স্বপ্ন এক হয়ে যাবে?কলেজের পুরনো ভবনটা দক্ষিণনগরের এক প্রান্তে, নদীর ধার ঘেঁষে।
বড় বড় গাছের ছায়ায় ঢাকা পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রুবির মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা যেন অন্যরকম। জানি না কেন, বাতাসেও একটা অজানা গন্ধ আছে—যেন ভেজা মাটির সঙ্গে মিশে আছে কোনো গোপন স্মৃতি।ক্লাস শুরু হয়েছে। রুবি চুপচাপ পেছনের বেঞ্চে বসে।
সামনে বোর্ডে বড় হরফে লেখা —
“Origin of tribal people and their behaviour “সান্দিপ ভট্টাচার্য আজ একটু অন্য মেজাজে আছেন। তাঁর গলা শান্ত, অথচ তাতে এমন গভীর সুর যে পুরো ক্লাসরুম নিঃশব্দ হয়ে যায়। তিনি বললেন—“আমরা প্রায়ই ইতিহাস বলতে রাজা-মহারাজা, যুদ্ধ বা সাম্রাজ্যের কথা বুঝি। কিন্তু সভ্যতার নিচে, মাটির গভীরে, এক অন্য ইতিহাস প্রবাহিত—আদিম মানুষের আত্মার ইতিহাস। আজ আমরা সেই দিকটা দেখব।
”রুবি মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। জানালার বাইরে রোদ ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে পড়ছে, বাতাসে পাতা নড়ছে, আর তাঁর কণ্ঠে গল্পের মতো ঝরে পড়ছে প্রাচীন কালের কথা।“তুমি কি জানো,” স্যার বললেন, “ভারতের অনেক অরণ্য-উপজাতির রীতি আজও এক রহস্যময় ধারায় প্রবাহিত। তাদের উৎসব, গান, নৃত্য, সবকিছুই প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলার ভাষা। তারা বিশ্বাস করে—গাছেরও আত্মা আছে, নদীরও মন আছে, আর মানুষ সেই আত্মাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে রীতির মাধ্যমে।”রুবির মনে হল, তিনি যেন কোথাও শুনেছেন এই কথাগুলো… হয়তো সেই স্বপ্নে?স্যার চক হাতে নিয়ে বোর্ডে আঁকলেন এক বৃত্ত—চারপাশে সূর্য, চাঁদ, আগুন আর জল-এর চিহ্ন।“
এটাই তাদের জগতের চক্র,” তিনি বললেন। “তাদের কাছে রীতি মানে শরীরের নয়, আত্মার অনুশাসন। তারা বিশ্বাস করে, যখন মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়, তখনই সত্য জ্ঞান লাভ করে। অনেক রীতিতে তারা মন্ত্র উচ্চারণ করে, আগুনে ঘি ঢালে, আর ধীরে ধীরে নিজেদের মধ্যে প্রবেশ করে এমন এক স্তরে, যেখানে আত্মা আর দেহ আলাদা থাকে না।”রুবির কানে শব্দগুলো যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। “আত্মা আর দেহ আলাদা থাকে না…” — এ যেন কোনো অচেনা সুর তার মনের ভেতর ঢুকে পড়ছে।
সান্দিপ ভট্টাচার্য হালকা হাসলেন, “এই রীতিগুলোর কিছু আমরা তান্ত্রিক বলে জানি। কিন্তু তন্ত্র মানে কেবল রহস্য বা অলৌকিকতা নয়। এটি জ্ঞানের এক প্রাচীন পদ্ধতি—যেখানে প্রতিটি ক্রিয়া, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নিশ্বাস, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে সংযোগের এক সেতু। আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, আমাদের অবচেতনে সেই আদিম চেতনার স্রোত আজও বয়ে চলেছে।”পুরো ক্লাস নীরব। বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। রুবি টের পেল, তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হচ্ছে।
জানলার বাইরের আলোটা মৃদু কাঁপছে—যেন রোদ নয়, আগুনের ছায়া।স্যার আবার বললেন,“এই রীতিগুলোর উদ্দেশ্য ভয় নয়, আত্ম-জাগরণ। মানুষ যখন নিজের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখনই সে আলোর অর্থ বোঝে। এই কারণেই আমাদের ইতিহাস কেবল রাজবংশের নয়, এটা আত্মারও ইতিহাস।”রুবির মনে পড়ল সকালে দেখা সেই অস্পষ্ট স্বপ্নের কথা—কেউ যেন তাকে ডেকেছিল, কোনো অচেনা বনে, আগুনের আলোয়…বেল বাজল। ক্লাস শেষ। সবাই বেরিয়ে গেল। রুবি কিছুক্ষণ বসে রইল, স্থির হয়ে।
সান্দিপ ভট্টাচার্য বই গুছিয়ে চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর শেষ কথা যেন এখনো বাতাসে ভাসছে—”তুমি যাকে বাস্তব ভাবছ, সেটাই হয়তো কারও প্রাচীন স্বপ্ন।”রুবির মনে হল, স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা সত্যিই ঝাপসা হয়ে আসছে।দক্ষিণনগরের বিকেলে আলো ক্রমে নরম হচ্ছে, আর তার ভেতর দিয়ে যেন অরণ্যের কোনো পুরনো ডাক ফিরে আসছে—শুধু রুবির জন্য।
ছায়ার ডাক তৃতীয় পর্ব। ছায়ার ডাক পঞ্চম পর্ব
আমাদের অন্যান্য গল্প
এছাড়াও সাসপেন্স থ্রিলার এ ব্যাবহারিত বিভিন্ন শব্দ অর্থাৎ কালাজাদু ও বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারত জানতে Wikipedia.com visit করতে পারবেন