মীরার অভিশাপ

কালকেতুর জীবনে বাঁশবনের সেই ঘটনার পর থেকে অদ্ভুত এক পরিবর্তন এসেছে। স্কুলে পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা—সব চললেও তার ভেতর অস্থিরতা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
মাঝে মাঝেই চোখের সামনে এমন দৃশ্য ভেসে উঠত, যেগুলো আর পাঁচজন দেখতে পেত না। কখনও মরা মানুষের ছায়া, কখনও আবার হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো অচেনা কণ্ঠস্বর।
সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ গ্রামে খবর ছড়াল—মীরা নামে এক মেয়ে কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। ডাক্তার, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁক—সব চেষ্টা করেও কোনো কাজ হয়নি।
ওর মা একেবারে ভেঙে পড়েছেন।কালকেতুর ভেতরটা কেমন যেন আলোড়িত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, এই ঘটনাটার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে তার যোগ আছে। ভয় আর কৌতূহল মিশে তাকে টেনে নিল মীরাদের বাড়ির দিকে।রাত নেমে এসেছে। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।
কালকেতু দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে এক অস্বাভাবিক ঠান্ডা হাওয়া বেরোল।
সে মুহূর্তে তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল—এটা সাধারণ কোনো অসুখ নয়, এখানে অন্য কিছু আছে।মীরার মা কাঁপা হাতে তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
মীরাকে দেখে কালকেতুর গা শিউরে উঠল। মেয়ে শান্তভাবে শুয়ে আছে, কিন্তু মুখ ফ্যাকাশে, চোখ কোটরে ঢুকে গেছে, ঠোঁট নীলচে।
মনে হচ্ছিল ওর প্রাণশক্তি যেন ধীরে ধীরে কেউ শুষে নিচ্ছে।“কী হয়েছে ওর?” কালকেতু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।মীরার মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “তিনদিন ধরে কিছু খাচ্ছে না।
হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে চিৎকার করে, বলে কেউ তাকে ডাকছে… আমি তো বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে।”ঠিক তখনই ঘরের এক কোণে অদ্ভুত নড়াচড়া শুরু হলো।
কালকেতু তাকাতেই দেখল—ধোঁয়ার মতো একটা ছায়া জমাট বাঁধছে। ঠান্ডা আরও বাড়ল, জানালার কপাট হঠাৎ জোরে ধাক্কা খেয়ে বন্ধ হয়ে গেল।
এক ভাঙা কর্কশ গলা কানে বাজল—“সে আমার জিনিস নিয়েছে… ফেরত দাও… না হলে ছাড়ব না।”কালকেতুর হাত-পা কাঁপছিল, কিন্তু চোখ সরাতে পারল না।
ছায়াটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল কেবল প্রতিশোধের আগুন।মীরার শরীর হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল।
সে বিছানায় ছটফট করছে, যেন কারও অদৃশ্য হাত তার গলা চেপে ধরেছে।কালকেতুর মনে পড়ল বাঁশবনের সেই দিন দেখা বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কথা—“শক্তি যখন তোর ভেতরে জাগবে, ভয় পাবি না।
চোখ দিয়েই সত্যি চিনবি।”সে চোখ বন্ধ করল, মনকে শক্ত করল। আবার তাকাতেই দেখল, মীরার বালিশের নিচ থেকে অদ্ভুত আলো বেরোচ্ছে।
কালো পাথর বসানো এক পুরোনো কঙ্কণ সেখানে লুকোনো আছে।
ছায়াটা ফিসফিস করে বলল, “ওটা আমার… ফেরত দাও…”কালকেতু বুঝল, রহস্যের সূত্রপাত এই কঙ্কণ থেকেই।
2 thoughts on “কালকেতু: তৃতীয় অংশ”