আমাদের নতুন সাসপেন্স থ্রিলার গল্প ছায়ার ডাক নিয়ে আমরা হাজির হয়েছি আশা করি আমাদের আগের গল্প মত আপনারা এটিকেও অনেক ভালোবাসা দেবেন ।
ছায়ার ডাক : প্রথম পর্ব
অন্ধকার কক্ষটিতে আর্দ্রতা যেন হাড়ের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। দেয়ালগুলো কেমন যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছিল—বছরের পর বছর ধরে আটকানো কান্না, চিৎকার, আর ফিসফাসের ভারে ভারী হয়ে ওঠা সেই বাতাস আজও তেমনি ভারাক্রান্ত। মাটিতে জল চুঁইয়ে পড়ার শব্দটা যেন কোনো অদৃশ্য ঘড়ির টিকটিকের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিল কক্ষের মাঝখানে। তার দু’হাত শক্ত দড়িতে বাঁধা, পায়েও শিকল। চুল এলোমেলো, তবু তার মুখে এমন এক স্থিরতা, যা অন্ধকারকেও কাঁপিয়ে দেয়।
টিমটিমে আলোয় মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছিল তার চোখদুটি—কালো, গভীর, আর অদ্ভুতভাবে শান্ত। যেন সেই চোখের ভেতরে এক অন্য জগৎ লুকিয়ে আছে, যেখানে ভয়, যন্ত্রণা বা লজ্জার কোনো অস্তিত্ব নেই।দূরে টিমটিম করছে একটি মশাল। আলোটা কাঁপছে, তার ছায়া দীর্ঘ হয়ে মাটির ওপর পড়ছে। ছায়াগুলোর ভেতর থেকে দুইটি অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যায়—দুইজন প্রহরী। তারা ফিসফিসিয়ে কথা বলছে, যেন কারও নজর এড়াতে চায়।“এত প্রমাণের পরও রাজাধিরাজ তাকে মুক্তি দিলেন?”—প্রথমজনের কণ্ঠে অবিশ্বাস।“কীভাবে সম্ভব বলো তো?”দ্বিতীয়জন ঠোঁটের কোণে এক বিদ্রূপমিশ্রিত হাসি টেনে বলল,“তুমি জানো না, সে কে।
সে এমন এক দৃষ্টি রাখে—যা কারও বিচারবুদ্ধিকে গলিয়ে দেয়। এমনকি রাজাধিরাজেরও।”প্রথমজন একটু থমকে গেল।“তুমি বলতে চাও… রাজা… তার প্রতি—?”দ্বিতীয়জন চোখ টিপে বলল,“কে জানে? রাজনীতি, প্রেম, আর বিশ্বাসঘাতকতা—এই তিন জিনিসে কখনও স্পষ্ট সত্য থাকে না।”তারা দুজনই চুপ করে গেল। মেয়েটি কিছু শোনে না, কিন্তু অনুভব করে। সে জানে, তার নাম এখন প্রাসাদের প্রতিটি দেওয়ালে ফিসফাস। তাকে বলা হচ্ছে “রাষ্ট্রদ্রোহিণী”, “মায়াবিনী”, “অপশকুনী”—কিন্তু কেউই জানে না, তার অপরাধটা আসলে কী।ঠান্ডা পাথরের ওপর তার পা কাঁপছে, তবুও চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা। সেই দৃষ্টিতে ভয় নেই, অনুশোচনা নেই—শুধু এক তীক্ষ্ণ বিশ্বাস।
যেন সে জানে—এটা শেষ নয়।হঠাৎ বাইরে শিঙ্গা বাজল। দূরে প্রাসাদের আঙিনা জেগে উঠল। প্রহরীরা ছুটে গেল কক্ষের বাইরে। দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকল, সেই হাওয়ায় মশালের শিখা দুলে উঠল।মেয়েটি ধীরে চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটে এক ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল—শুকনো অথচ অদ্ভুতভাবে জীবন্ত।“রাজা আমাকে মুক্তি দেবেনই,” সে ফিসফিসিয়ে বলল নিজের সাথে, “কারণ আমি শুধু অভিযুক্ত নই… আমি তার ভাগ্য।”তার কণ্ঠের শব্দটুকুও যেন দেওয়ালের ভেতর লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে নাড়া দিল।—রাজাধিরাজ দেবব্রত—যে নাম শুনলে প্রজারা মাথা নোয়ায়, সৈন্যরা তলোয়ার উঁচু করে। কিন্তু সেই দেবব্রত আজ নিজের মনে এক অদ্ভুত যুদ্ধে লিপ্ত। সোনার আসনে বসেও তার চোখের নিচে ঘুমহীনতার ছাপ। সারা প্রাসাদে গুঞ্জন—তিনি আজ রাতে কারাগারে যাবেন। কেন? কেউ জানে না।“রাজা, আপনাকে নিরস্ত্রভাবে নিচে যেতে মানা করা হয়েছে,” সেনাপতি বলেছিল দুপুরে।
“তিনি এখন রাজবন্দী।”দেবব্রত একদৃষ্টে তাকিয়ে বলেছিলেন,“রাজবন্দী নয়… সে আমার দেশের আত্মা।”কথাটা শুনে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।—রাতের শেষ প্রহর। অন্ধকার কক্ষের দরজার বাইরে একটানা পদশব্দ শোনা গেল—গম্ভীর, নিয়ন্ত্রিত, অথচ হৃদয়ের তলায় তীব্র এক স্পন্দন বহন করে। প্রহরীরা দরজা খুলল।রাজাধিরাজ নিজে প্রবেশ করলেন। হাতে ছিল কেবল একটি প্রদীপ। আলো পড়তেই মেয়েটি চোখ খুলল।
“তুমি এসেছ?”—তার কণ্ঠ শান্ত, যেন কোন আশ্চর্যের কিছু নয়।দেবব্রত একটু থামলেন, তারপর এগিয়ে গেলেন। প্রদীপের আলোয় তাদের মুখোমুখি দেখা গেল—এক রাজা, এক বন্দিনী। অথচ এই মুহূর্তে কে শাসক, কে বন্দী—তা বোঝা কঠিন।“তুমি জানো, তারা কী বলে তোমায়?” রাজা প্রশ্ন করলেন।মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ। তারা বলে আমি বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু রাজাধিরাজ, সত্যের প্রতি বিশ্বাস রাখাটাও কি বিশ্বাসঘাতকতা?”দেবব্রত এক নিঃশ্বাসে চুপ করে গেলেন। সেই কণ্ঠে অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু এক গভীর সত্যের সুর।“আমি রাজ্যরক্ষা করি,” তিনি বললেন, “তুমি তার নীতি প্রশ্ন করেছ।”“আমি প্রশ্ন করিনি,” মেয়েটি ধীরে উত্তর দিল, “আমি কেবল দেখিয়েছি—যে নীতির ভিতেই অন্যায় জন্ম নেয়, তাকে মুকুট পরিয়ে রাখা যায় না।”এই উত্তর শুনে দেবব্রতের চোখে এক ঝলক আলো জ্বলে উঠল।
তিনি যেন এক মুহূর্তের জন্য রাজা নন, মানুষ হয়ে গেলেন—যে মানুষ ভালোবাসা আর কর্তব্যের মাঝখানে আটকে পড়েছে।“তুমি জানো, তোমায় মুক্তি দিলে আমার সিংহাসন কাঁপবে,” তিনি বললেন।“আর না দিলে?”“আমার আত্মা মরবে।”দু’জনেই চুপ। বাইরে আবার শিঙ্গা বাজল—ভোরের বার্তা। দূরে প্রাসাদের প্রাচীর সোনালি আভায় ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।মেয়েটি মাথা উঁচু করে বলল,“তুমি সিদ্ধান্ত নাও, দেবব্রত। রাজা হতে চাও, না মানুষ?”রাজাধিরাজের চোখ ভিজে উঠল। তিনি মশালের দিকে তাকালেন—তার শিখা দুলছে, যেমন দুলছে তার হৃদয়। ধীরে ধীরে তিনি এগিয়ে এসে মেয়েটির হাতের দড়ি খুলে দিলেন।
দড়ি পড়ে গেল মাটিতে, সেই শব্দটা যেন রাজপ্রাসাদের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হল।“তুমি মুক্ত,” দেবব্রত বললেন।“না,” মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, “তুমি মুক্ত করলে না, আমি তো জন্ম থেকেই মুক্ত।”এই বলে সে সামনে এগিয়ে এল। মশালের আলোয় তার মুখ যেন দীপ্ত হয়ে উঠল। “আমি তোমার রাজনীতি নই, দেবব্রত,” সে বলল শান্তস্বরে, “আমি সেই ভাগ্য, যাকে তুমি চাইলেও এড়াতে পারবে না।”দেবব্রত স্তব্ধ। তার মস্তিষ্কে যেন বজ্রপাত ঘটল। তিনি বুঝলেন, এই মেয়েটি কেবল একজন অভিযুক্ত নয়—সে এক প্রতীক। যে সত্যের সামনে রাজদণ্ডও ঝুঁকে পড়ে।বাইরে তখন সূর্যোদয় হচ্ছে। কারাগারের দরজায় আলো পড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। পাথরের গায়ে সোনালি রেখা ছুঁয়ে গেল।মেয়েটি একবার ফিরে তাকাল—রাজাধিরাজ তখনও দাঁড়িয়ে আছেন, প্রদীপ হাতে, নির্বাক।“বিদায়, মহারাজ,” সে বলল, “যখন ইতিহাস লিখবে, মনে রেখো—অভিযুক্তরাও কখনও কখনও রাজাদের রক্ষা করে।”এই বলে সে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।দরজার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকে পড়ল আরও গভীরভাবে। প্রহরীরা কেউই নড়ল না। যেন এই মুক্তি কোনও অপরাধ নয়, এক ভবিষ্যদ্বাণী।
আগামী পর্ব : ছায়ার ডাক
রাজাধিরাজ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার হাতে ধরা প্রদীপের শিখা নিভে গেল ধীরে ধীরে।অন্ধকার আবার ফিরে এল। কিন্তু এবার সেই অন্ধকার শান্ত। কারণ তার ভেতর জেগে উঠেছে এক আলোকরেখা—যা কোনো বন্দিনী নয়, এক চিরমুক্ত আত্মা রেখে গেছে।
আমাদের অন্যান্য গল্প
২) হারানো আলো
এছাড়াও সাসপেন্স থ্রিলার এ ব্যাবহারিত বিভিন্ন শব্দ অর্থাৎ কলজাদু ও বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারত জানতে Wikipedia.com visit করতে পারবেন।